বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২, ২০২০
Home > আন্তর্জাতিক > যুক্তরাষ্ট্রে বাঙালি কমিউনিটিতে পরকীয়া বিষ, আশ্রয় কেন্দ্রে ১৭১ বাঙালি বধূ

যুক্তরাষ্ট্রে বাঙালি কমিউনিটিতে পরকীয়া বিষ, আশ্রয় কেন্দ্রে ১৭১ বাঙালি বধূ

https://www.noakhalitimes.com

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :: অভিভাবকের ইচ্ছা অনুযায়ী বাংলাদেশে গিয়ে বিয়ের পর নবপরিণীতা গর্ভবতী হলে নিউইয়র্কে ফেরেন স্বামী। এরপর স্বামীর স্পন্সরে ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নিউইয়র্কে আসার পরই পরিত্যক্ত হয়েছেন। ডাউন টাউন ম্যানহাটানে স্বামীর অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতে পারেননি অসহায় সেই বধূ। 

খবর পেয়ে পুলিশ সেই বধূকে উদ্ধার করে সিটির শেল্টারে নেয়। সেখানেই গত ১৫ মার্চ কন্যা সন্তান প্রসব করেছেন সেই নারী। এ ধরনের ১৭১ বাংলাদেশি নারী বর্তমানে নিউইয়র্ক সিটির পাঁচ বরোতে অবস্থিত শেল্টারে অবস্থান করছেন। গত এক বছরে এ ধরনের আশ্রয় প্রার্থীর তালিকায় পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশি ছিলেন। স্বামীর নির্যাতনের পাশাপাশি শ্বশুর-শাশুড়ির বিরুদ্ধেও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ১৩ হাজার মাইল দূরে ভিন্ন এক সমাজে এসেও অনেকে সেই কালচার পরিহার করতে পারেননি। 

সর্বশেষ ১৮ মার্চ নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ স্কুল সেফটি এজেন্ট হিসেবে কর্মরত এক যুবককে ধরিয়ে দেয় তারই মেয়ে বন্ধু। তারা দুজনই বাংলাদেশি। ২২ বছর বয়সী মেয়েটি কুইন্সে অবস্থিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। মা-বাবার জ্ঞাতসারেই ২৬ বছর বয়েসী ওই সেফটি এজেন্টের সঙ্গে লিভ টুগেদার করছিলেন। সবকিছুই ঠিকমতো চলছিল। সম্প্রতি যুবকটি এনওয়াপিডির অফিসার হিসেবে ইন্টারভিউ দিয়ে টিকে গেছেন অর্থাৎ সামনের সপ্তাহেই তার ওই নতুন কর্মস্থলে যোগদানের কথা। এ নিয়ে ভিন্ন এক আমেজে ছিলেন যুবকটি। কিন্তু সবকিছু ধূলিসাৎ করেছেন মেয়ে বন্ধু। পুলিশে নির্যাতনের অভিযোগ করায় যুবকটিকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পরই তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে সেফটি এজেন্ট থেকে। অর্থাৎ যুবকটির ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকার।

২০ মার্চ এ তথ্য সংবাদ মাধ্যমকে জানান কমিউনিটি লিডার মাজেদা এ উদ্দিন। মাজেদা বলেন, মেয়েটি এরই মধ্যে আরেকটি ছেলের প্রেমে মজেছে। তাই পুরনো বন্ধুকে ত্যাগ করতে পুলিশ ডাকাডাকির ঘটনা ঘটিয়েছেন। মেয়েটির বাবাকে অনুরোধ করেছি পুলিশে দেয়া অভিযোগ যেন প্রত্যাহার করা হয়। তাহলেই ছেলেটি নতুন কর্মস্থলে যোগদানে সক্ষম হবেন। 

কুইন্স, ব্রঙ্কস, ব্রুকলীন, ম্যানহাটান এবং স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের শেল্টারে অবস্থানকারীদের তথ্য সংগ্রহের সময় জানা গেছে, স্বামী/স্ত্রীর মধ্যকার অবিশ্বাসই গৃহদাঙ্গার মূল কারণ। আর এর উদ্ভব হয়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরকীয়া থেকে। বিশেষ করে ফেসবুকে আসক্ত নারী-পুরুষেরা বিবাহিত স্ত্রী-স্বামীর চেয়ে নতুন বান্ধবী নিয়েই বেশি ব্যস্ত। অনেকের সন্তান রয়েছে। শিশু সন্তানকেও এসব মা-বাবা তেমন পাত্তা দিচ্ছে না। 

আরও জানা গেছে, বেশ কিছু পুলিশ ডাকাডাকির নেপথ্যে অভিবাসনের মর্যাদা সুরক্ষার মতলব কাজ করেছে। সামান্য সংখ্যক পরিবারে এমন ভাঙনের অবতারণা হয়েছে ট্যাক্স রিটার্নের অর্থ-লোভে। স্বামী এবং স্ত্রী পৃথক হয়ে পড়লে অনেক বেশি রিটার্ন আসে বলে নারী-পুরুষের ধারণা।

বেশ কিছু ঘটনায় শ্বশুর-শাশুড়ির বদমেজাজ প্রভাব ফেলেছে। পুত্রবধূ কর্মস্থলে সহকর্মীর সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করতেই পারেন কিন্তু তা সহ্য হয়নি ওইসব শ্বশুর-শাশুড়ির। তারা ছেলেকে দিয়ে পুত্রবধূর প্রতি অবিশ্বাসের জাল বুনেছিলেন। তাদের ছেলেও যে কর্মস্থলে নারী সহকর্মীর সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করেন-সেটি কোনো অন্যায় নয় বলে মন্তব্য মাজেদার। 

ব্রুকলিন এবং কুইন্সের সীমানা এলাকা তথা ওজোনপার্কে বহু বছর যাবৎ সামাজিক কাজ কর্মে খ্যাতি অর্জনকারী মিসবা আবদিন এ প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশি পরিবারে বিবাদ-বিভক্তি উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এর অবসানে কাউন্সেলিং দরকার। মামুলি ব্যাপারেও ঝগড়া থেকে মারপিটের উপক্রম হচ্ছে। 

মাজেদা এ উদ্দিন বলেন, অল্প শিক্ষিত কিছু মানুষ প্রবাসে নানাভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্ত হচ্ছেন মানবিক মূল্যবোধহীন কর্মে। সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে মিশতে গিয়ে অনেক সময়েই কেউ কেউ নিজেকে সামাল দিতে পারছেন না। অবাধ স্বাধীনতার সুযোগে সংসার ভাঙছেন। মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে অর্জিত অর্থই শুধু খোয়াচ্ছেন না, একই সঙ্গে সামাজিকভাবেও হেয়-প্রতিপন্ন হচ্ছেন। 

জানা গেছে, স্বামী-স্ত্রীর বিরোধের পরিণতি হিসেবে অনেকে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশেও ফিরে গেছেন। আবার কেউ কেউ সাময়িক লোভ-লালসার পর-পুরুষের হাত ধরে ঘর ছাড়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বোধোদয় ঘটেছে। তবে ভাঙা সংসার আর জোড়া লাগেনি। 

এ প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি মো. আবদুল আজিজ বলেন, পারিবারিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সজাগ লোকজনের পক্ষে কখনোই এমন চরম অবস্থায় যাওয়া সম্ভব নয়। তবে যারা নতুন বসতি স্থাপন করে খুব দ্রুত আমেরিকান সাজতে চায়, তারাই কথায় কথায় পুলিশ ডাকেন। একবার পুলিশের কবলে গেলে ছোটখাটো বিরোধকেও অনেক সময় মিটিয়ে ফেলা সম্ভব হয় না। 

অ্যাটর্নি আজিজ উল্লেখ করেন, আমার জানামতে অনেক পুরুষকেও গৃহহারা হতে হচ্ছে। তারা হোটেল-মোটেল অথবা ঘনিষ্ঠদের বাসায় অবস্থানে বাধ্য হচ্ছেন। তবে যে সব নারীর আত্মীয়-স্বজন নেই, তাদেরই আশ্রয়ে থাকতে হচ্ছে। 

অ্যাটর্নি আজিজ বলেন, কমিউনিটিতে অনেক সংগঠন রয়েছে। মসজিদ-মন্দির-চার্চও রয়েছে। তারা কাউন্সেলিংয়ের দায়িত্বটি পালন করতে পারেন। তাহলেও হয়তো এমন নাজুক পরিস্থিতি কমানো যাবে। শত শত মানুষ যদি পুলিশ ডাকাডাকি করেন এবং নারীদের যদি সিটির শেল্টারে অবস্থান করতে হয়, তাহলে সেটি কোনো ভাবেই কমিউনিটির জন্য সুখকর কোনো বিষয় হতে পারে না। এ বদনামের ভাগিদার কমিউনিটির সবাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *