রবিবার, ফেব্রুয়ারী ২৩, ২০২০
Home > মুক্তমত > ঈসা নবীঃ জগতের অপার বিস্ময়, অফুরাণ রহস্য

ঈসা নবীঃ জগতের অপার বিস্ময়, অফুরাণ রহস্য

গোলাম সারোয়ার :: ইব্রাহীমীয় ধর্মগুলো হলো একেশ্বরবাদী ধর্ম। একেশ্বর মানে হলো জগতের সৃষ্টিকর্তা একজন।  বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্ন নামে তাঁকে ডাকা হয়। বর্তমান পৃথিবীর প্রধান ধর্মগুলোর মাঝে ইহুদী, খ্রিস্টান এবং ইসলাম ধর্মগুলো হলো ইব্রাহিমীয় ধর্ম। ইহুদী খ্রিস্টানগণ ইব্রাহিমকে বলেন আব্রাহাম।  মানে পিতা হযরত ইব্রাহিমের (আঃ)-এঁর অনুসারী এবং তাঁর বংশধরদের ভিতর থেকে সৃষ্টিকর্তার মনোনীত পয়গম্বরদের ধর্ম হলো আব্রাহামীয় ধর্ম ।

ইব্রাহিমীয় ধর্মগুলোর মাঝে সর্বশেষ ধর্মহলো ইসলাম ধর্ম।  ইসলাম ধর্মমতে পৃথিবীতে নবী রাসুল  এসেছেন ১,২৪,০০০, মতান্তরে ২,২৪,০০০ জন। তার ভিতরে ৩১৫ জন হচ্ছেন রাসুল। ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনে উল্লেখ আছেন পঁচিশ জন নবীর কথা। বাকী পয়গম্বরদেরও ইসলাম স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন। ইসলাম স্বীকার করে সকল নবী রাসুলকে এবং চার জন বড় পয়গম্বরকে। এই চারজন হলেন যথাক্রমে দাউদ (আঃ), মুসা(আঃ), ঈশা(আঃ) এবং মুহাম্মদ (সঃ)।

ঈশা নবীকে হিব্রু ইহুদীরা স্বীকার করেন না ।  খ্রিস্টানরা তাঁকে তাঁদের নবী মানেন।  তাঁরা ঈসা নবীকে বলেন যীশু।  খ্রিস্টানরা ইহুদীদের নবী মুসা(আঃ) এবং দাউদ(আঃ)কেও মানেন। তাঁরা দাউদ নবীকে বলেন ডেবিড এবং মুসা নবীকে বলেন মোজেস। ইসলাম ধর্মে চারজন নবীকে মানা হলেও পুরোনো ধর্মগুলো ইসলাম ধর্মকে এখনো স্বীকৃতি দেননি।  তবে চৌদ্দশ বছরের ধারাবাহিক ইতিহাস বলে ইসলাম একটি ক্রমবর্ধমান ধর্ম।

বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষের ধর্মহলো খ্রিস্টান আর সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন ইসলাম।   অনুসারী মানব সমাজের বিবেচনায় সে হিসেবে বর্তমানে সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্ম হলো খ্রিস্টান। ধর্মগুলোর অনুসারীদের গতিই বলে দিচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে ইসলামই হবে সবচেয়ে বেশি মানুষের ধর্ম।  কারণ ইসলাম ধর্ম বয়সে সর্বকনিষ্ঠ হলেও এই ধর্মে রয়েছে সর্বাধুনিক কর্মপ্রন্থার নির্যাস।  ইসলাম পূর্ববতী সব নবী রাসুলের মতো ঈসা নবীকেও মানেন।

নবী ঈসার জন্ম মানব জাতির ইতিহাসে একটি রহস্য এবং বহুল আলোচনা সমালোচনার সাবজেন্ট।

ঈশা নবী সম্পর্কে জগতে এবং কিতাবে অনেক ধারনাই আছে।  আনুমানিক ৬-৩০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বিবি মারইয়াম নাছেরা নামক একটি শহরের অধিবাসী ছিলেন।  নাছেরা শহরটি বাইতুল মুকাদ্দাসের অদূরেই অবস্থিত ।

বিবি মারইয়াম পিতা মাতার মানত পূর্ণ করার জন্য বাইতুল মুকাদ্দাসের খেদমতে নিযুক্ত হন। তিনি বাল্যকাল থেকেই অতিশয় সুশীলা এবং ধর্মানুরাগিণী ছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিল ইমরান এবং তাঁর মাতা ছিলেন নবী যাকারিয়া (আ.)-এর শ্যালিকা বিবি হান্না।

হযরত মারইয়ামের পিতা ইমরান ছিলেন বনী ইসরাইলের একজন বুজুর্গ লোক । তিনি ছিলেন হযরত দাউদ (আঃ) এর বংশধর। মরিয়মের মাতার সন্তান হচ্ছিল না। তিনি একটি সন্তানের জন্য অত্যন্ত ব্যাকুল হলেন। তখন তিনি আল্লাহর কাছে মানত করেন যে, আল্লাহ পাক যদি তাঁকে একটি সন্তান দান করেন তবে তিনি সন্তানটিকে বাইতুল মুকাদ্দাসের খেদমতে দান করবেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলেন।

কোরআনের আয়াত হলো, ‘ইমরানের স্ত্রী যখন বললো-হে আমার পালনকর্তা! আমার গর্ভে যা রয়েছে আমি তাকে তোমার নামে উৎসর্গ করলাম সবার কাছ থেকে মুক্ত রেখে। আমার পক্ষ থেকে তুমি তাকে কবুল করে নাও, নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞাত। অতঃপর যখন তাকে প্রসব করলো বলল, হে আমার পালনকর্তা! আমি একে কন্যা প্রসব করেছি। বস্তুতঃ কি সে প্রসব করেছে আল্লাহ তা ভালই জানেন। সেই কন্যার মত কোন পুত্রই যে নেই। আর আমি তার নাম রাখলাম মারইয়াম। আর আমি তাকে ও তার সন্তানদেরকে তোমার আশ্রয়ে সমর্পণ করছি, অভিশপ্ত শয়তানের কবল থেকে। (আলে ইমরানঃ ৩৫-৩৬)

‘আল্লাহ তায়া’লা তার মায়ের মানত কবুল করেন।অতঃপর তাঁর পালনকর্তা তাঁকে উত্তম ভাবে গ্রহণ করে নিলেন এবং তাঁকে প্রবৃদ্ধি দান করলেন-অত্যন্ত সুন্দর প্রবৃদ্ধি। (আলে ইমরানঃ ৩৭)

‘তথা সুন্দর, উজ্জ্বল চেহারা ও সৌভাগ্যবান নেককারদের পথ প্রদান করলেন। আর তাঁকে যাকারিয়ার তত্ত্বাবধানে সমর্পন করলেন। (আলে ইমরানঃ ৩৭)

আল্লাহ তা’আলা হযরত মারইয়ামকে একজন নবীর তত্ত্বাবধানে বড় হওয়ার সুযোগ দেন। যখনই হযরত যাকারিয়া (আঃ) মারইয়ামের কাছে আসতেন তখনই কিছু খাবার দেখতে পেতেন। জিজ্ঞেস করতেন “মারইয়াম! কোথা থেকে এসব তোমার কাছে এলো?” তিনি বলতেন, “এসব আল্লাহর নিকট থেকে আসে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বেহিসাব রিযিক দান করেন। (আলে ইমরানঃ ৩৭) ‘আর যখন ফেরেশতা বলল হে মারইয়াম!, আল্লাহ তোমাকে পছন্দ করেছেন এবং তোমাকে পবিত্র পরিচ্ছন্ন করে দিয়েছেন। আর তোমাকে বিশ্ব নারী সমাজের উর্ধ্বে মনোনীত করেছেন। হে মারইয়াম! তোমার পালনকর্তার উপাসনা কর এবং রুকুকারীদের সাথে সেজদা ও রুকু কর। (আলে ইমরানঃ ৪২-৪৩)

‘এই কিতাবে মারইয়ামের কথা বর্ণনা করুন, যখন সে তার পরিবারের লোকজন থেকে পৃথক হয়ে পূর্বদিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল। অতঃপর তাদের থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্যে সে পর্দা করলো। অতঃপর আমি তার কাছে আমার রূহ প্রেরণ করলাম, সে তার নিকট পুর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করল। (মারইয়ামঃ ১৬-১৭)

জিব্রাইল (আঃ) কে দেখে মারইয়াম (আঃ) ভয় পেলেন।  মারইয়াম বললঃ আমি তোমা থেকে দয়াময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করি যদি তুমি আল্লাহভীরু হও। সে বললঃ আমি তো শুধু তোমার পালনকর্তা প্রেরিত, যাতে তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করে যাব। ‘(মারইয়ামঃ ১৮-১৯)

হযরত মারইয়াম আশ্চর্য হলেন কারণ তিনি ছিলেন চিরকুমারী। মরিইয়াম বললঃ কিরূপে আমার পুত্র হবে, যখন কোন মানব আমাকে স্পর্শ করেনি এবং আমি ব্যভিচারিণীও কখনও ছিলাম না?’ (মারইয়ামঃ ২০)

জিব্রাইল (আঃ) তাঁকে সুসংবাদ দিয়ে বললেন, এমনিতেই হবে। তোমার পালনকর্তা বলেছেন, ‘এটা আমার জন্যে সহজ সাধ্য এবং আমি তাকে মানুষের জন্যে একটি নিদর্শন ও আমার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ স্বরূপ করতে চাই। এটা তো এক স্থিরীকৃত ব্যাপার। (মারইয়ামঃ ২১)

অতঃপর আল্লাহর আরেক অলৌকিক নিদর্শন হিসেবে ঈসা(আঃ)- এর জন্ম হলো। বস্তুত  ঈসা (আঃ) এর জন্ম একটি মু’জিযা, আল্লাহর সৃষ্টির এক মহান নিদর্শন, যেমনিভাবে তিনি আদম (আঃ) কে পিতা ছাড়া সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত হচ্ছে আদমেরই মতো। তাকে মাটি দিয়ে তৈরী করেছিলেন এবং তারপর তাকে বলেছিলেন হয়ে যাও, সঙ্গে সঙ্গে হয়ে গেলেন। যা তোমার পালকর্তা বলেন তাই হচ্ছে যথার্থ সত্য। কাজেই তোমরা সংশয়বাদী হয়ো না।'(আলে ইমরানঃ ৫৯-৬০)

কিন্তু সম্প্রদায়ের লোকেরাতো সহজে এটি বিশ্বাস করবে না কিংবা মেনে নিবেন না। তাই তিনি দূরবর্তী স্থানে চলে গেলেন।  ‘অতঃপর তিনি গর্ভে সন্তান ধারণ করলেন এবং তৎসহ এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেলেন। (মারইয়ামঃ ২২)

প্রসব বেদনা তাঁকে এক খেজুর বৃক্ষের তলে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। কষ্টে, বেদনায় এবং মরমে তিনি বললেনঃ ‘হায়, আমি যদি কোনরূপে এর পূর্বে মরে যেতাম এবং মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতাম!’ (মারইয়ামঃ ২৩)

অতঃপর ফেরেশতা তাঁকে নিম্নদিক থেকে আওয়াজ দিলেন যে, তুমি দুঃখ করো না। তোমার পালনকর্তা তোমার পায়ের তলায় একটি নহর জারি করেছেন। আর তুমি নিজের দিকে খেজুর গাছের কান্ডে নাড়া দাও, তা থেকে তোমার উপর সুপক্ক খেজুর পতিত হবে। তখন আহার কর, পান কর এবং চক্ষু শীতল কর। যদি মানুষের মধ্যে কাউকে তুমি দেখ, তবে বলে দিওঃ আমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে রোযা মানত করছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোন মানুষের সাথে কথা বলব না। (মারইয়ামঃ ২৪-২৬)

যখন সম্প্রদায়ের লোকজন কাছে এলো তখন পবিত্র স্বতীসাধ্বী এই নারীর জন্যে ঐ সাক্ষাৎ ছিল খুবই কঠিনতম ব্যাপার। অতঃপর তিনি সন্তানকে নিয়ে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থিত হলেন। তারা বললঃ হে মারইয়াম, তুমি একটি অঘটন ঘটিয়ে বসেছ। হে হারূণ-ভাগিনী, তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিলেন না এবং তোমার মাতাও ছিল না ব্যভিচারিনী। (মারইয়ামঃ ২৭-২৮)

তিনি কোন উত্তর দেননি, বরং তিনি ইশারা করলেনঃ, ‘অতঃপর তিনি হাতে সন্তানের দিকে ইঙ্গিত করলেন।’ (মারইয়ামঃ ২৯)। মানে তিনি ইশারায় বলতে চাইলেন, তোমরা তাকেই জিজ্ঞেস কর । তারা বললঃ যে কোলের শিশু তার সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব? (মারইয়ামঃ ২৯)

শিশু সন্তান বললঃ আমি তো আল্লাহর দাস। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন জীবিত থাকি, ততদিন নামায ও যাকাত আদায় করতে। এবং জননীর অনুগত থাকতে এবং আমাকে তিনি উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি। আমার প্রতি সালাম যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন পুনরুজ্জীবিত হয়ে উত্থিত হব। (মারইয়ামঃ ৩০-৩১)

কিন্তু কতিপয় ইহুদীরা একথা বিশ্বাস করলোনা। তারা পবিত্র মারইয়ামকে যিনার অপবাদ দিল। কিন্তু আল্লাহ তায়া’লা তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করেন, আল্লাহ তায়া’লা তাঁর সম্পর্কে বললেনঃ আর তার জননী একজন ওলী। (মায়েদাঃ ৭৫)

ঈসা (আঃ)-এঁর পরিণত বয়সেও আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিলেন, ‘হে ঈসা ইবনে মরিয়ম, তোমার প্রতি ও তোমার মাতার প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ কর, যখন আমি তোমাকে পবিত্র আত্মার দ্বারা সাহায্য করেছি। তুমি মানুষের সাথে কথা বলতে কোলে থাকতে এবং পরিণত বয়সেও এবং যখন আমি তোমাকে গ্রন্থ, প্রগাঢ় জ্ঞান, তওরাত ও ইঞ্জিল শিক্ষা দিয়েছি।’ (মায়েদাঃ ১১০)

আল্লাহ তাঁকে মু’জিযা ও অলৌকিক নিদর্শন দিয়ে সাহায্য ও শক্তিশালী করলেন,  ‘এবং যখন তুমি কাদামাটি দিয়ে পাখীর প্রতিকৃতির মত প্রতিকৃতি নির্মাণ করতে আমার আদেশে, অতঃপর তুমি তাতে ফুঁ দিতে; ফলে তা আমার আদেশে পাখী হয়ে যেত এবং তুমি আমার আদেশে জন্মান্ধ ও কুষ্টরোগীকে নিরাময় করে দিতে এবং যখন আমি বনী-ইসরাঈলকে তোমা থেকে নিবৃত্ত রেখেছিলাম, যখন তুমি তাদের কাছে প্রমাণাদি নিয়ে এসেছিলে, অতঃপর তাদের মধ্যে যারা কাফের ছিল, তারা বললঃ এটা প্রকাশ্য জাদু ছাড়া কিছুই নয়। আর যখন আমি হাওয়ারীদের মনে জাগ্রত করলাম যে, আমার প্রতি এবং আমার রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, তখন তারা বলতে লাগল, আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম এবং আপনি সাক্ষী থাকুন যে, আমরা অনুগত্যশীল। (মায়েদাঃ ১১১)

হাওয়ারীরা ঈসা (আঃ) কে আসমান থেকে খাদ্য নাযিল হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে বললেন।  আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ ‘যখন হাওয়ারীরা বলল, হে মরিয়ম তনয় ঈসা, আপনার পালনকর্তা কি এরূপ করতে পারেন যে, আমাদের জন্যে আকাশ থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করে দেবেন? (মায়েদাঃ ১১২)

ঈসা ইবনে মারইয়াম বললেনঃ হে আল্লাহ আমাদের পালনকর্তা আমাদের প্রতি আকাশ থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করুন। তা আমাদের জন্যে অর্থাৎ, আমাদের প্রথম ও পরবর্তী সবার জন্যে আনন্দোৎসব হবে এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন হবে। আপনি আমাদের রুযী দিন। আপনিই শ্রেষ্ট রুযীদাতা। আল্লাহ বললেনঃ নিশ্চয় আমি সে খাঞ্চা তোমাদের প্রতি অবতরণ করব। অতঃপর যে ব্যাক্তি এর পরেও অকৃতজ্ঞ হবে, আমি তাকে এমন শাস্তি দেব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অপর কাউকে দেব না’। (মায়েদাঃ ১১৪-১১৫)

তারপর যখন মায়েদা নাযিল হলো তখনও বনী ইসরাইলের কতিপয় ইহুদীরা কুফুরী করল।  তারা ষড়যন্ত্র করলো ও ঈসা (আঃ) কে শূলে চড়ানোর চেষ্টা করলো ‘এবং কাফেরেরা চক্রান্ত করেছে আর আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করেছেন। বস্তুতঃ আল্লাহ হচ্ছেন সর্বোত্তম কৌশলী।'(আলে ইমরানঃ ৫৪)

আল্লাহ তায়া’লা নবীকে তাদের ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দিলেন।  তিনি জানিয়ে দিলেন, কিভাবে তিনি তাঁকে রক্ষা করবেন। ‘আর স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বললেন, হে ঈসা! আমি তোমাকে নিয়ে নেবো এবং তোমাকে নিজের দিকে তুলে নিবো-কাফেরদের থেকে তোমাকে পবিত্র করে দেবো। আর যারা তোমার অনুগত রয়েছে তাদেরকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত যারা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে তাদের উপর জয়ী করে রাখবো। বস্তুতঃ তোমাদের সবাইকে আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে। তখন যে বিষয়ে তোমরা বিবাদ করতে, আমি তোমাদের মধ্যে তার ফয়সালা করে দেবো। (আলে ইমরানঃ ৫৫)

আল্লাহ তায়া’লা তাঁকে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করলেনঃ ‘অথচ তারা না তাকে হত্যা করেছে, আর না শুলীতে চড়িয়েছে। (নিসাঃ ১৫৭)

এভাবে তাদের কুফুরীর ফলস্বরুপ আল্লাহ তায়া’লা তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আল্লাহ বলেনঃ ‘অতএব, তারা যে শাস্তিপ্রাপ্ত হয়েছিল, তা ছিল তাদেরই অঙ্গীকার ভঙ্গের জন্য এবং অন্যায়ভাবে রসূলগণকে হত্যা করার কারণে এবং তাদের এই উক্তির দরুন যে, আমাদের হৃদয় আচ্ছন্ন। অবশ্য তা নয়, বরং কুফরীর কারণে স্বয়ং আল্লাহ তাদের অন্তরের উপর মোহর এঁটে দিয়েছেন। ফলে এরা ঈমান আনে না কিন্তু অতি অল্পসংখ্যক। আর তাদের কুফরী এবং মরিয়মের প্রতি মহা অপবাদ আরোপ করার কারণে। আর তাদের একথা বলার কারণে যে, আমরা মরিয়ম পুত্র ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি যিনি ছিলেন আল্লাহর রসূল। (নিসাঃ ১৫৫-১৫৭)

বস্তুত বনী ইসরাইল ঈসা (আঃ)-এঁর অনুরূপ চেহারার একজনকে হত্যা করেছেঃ ‘বরং তারা এরূপ ধাঁধায় পতিত হয়েছিল। বস্তুতঃ তারা এ ব্যাপারে নানা রকম কথা বলে, তারা এক্ষেত্রে সন্দেহের মাঝে পড়ে আছে, শুধুমাত্র অনুমান করা ছাড়া তারা এ বিষয়ে কোন খবরই রাখে না। আর নিশ্চয়ই তাঁকে তারা হত্যা করেনি। বরং তাঁকে উঠিয়ে নিয়েছেন আল্লাহ তা’আলা নিজের কাছে। আর আল্লাহ হচ্ছেন মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা নিসাঃ ১৫৭-১৫৮)

আল্লাহ স্বয়ং সাক্ষ্য দেন, আল্লাহ তায়া’লা তাঁর বান্দা ও রাসুল ঈসা (আঃ) কে রক্ষা করে আসমানে তুলে নেনঃ ‘আর আহলে-কিতাবদের মধ্যে যত শ্রেণী রয়েছে তারা সবাই ঈমান আনবে ঈসার উপর তাদের মৃত্যুর পূর্বে। আর কেয়ামতের দিন তাদের জন্য সাক্ষীর উপর সাক্ষী উপস্থিত হবে। ‘(সূরা নিসাঃ ১৫৯)

‘আর ইহাই হলো ঈসা ইবনে মারইয়ামের (আঃ) প্রকৃত ঘটনা। এই মারইয়ামের পুত্র ঈসা। সত্যকথা, যে সম্পর্কে লোকেরা বিতর্ক করে। আল্লাহ এমন নন যে, সন্তান গ্রহণ করবেন, তিনি পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা, তিনি যখন কোন কাজ করা সিদ্ধান্ত করেন, তখন একথাই বলেনঃ হও এবং তা হয়ে যায়। ‘(মারইয়ামঃ ৩৪-৩৫)

যারা বিতর্ক করে বলেন তাদের কথার জবাব দিয়েছেন সূরা নাহলে, ‘যিনি সৃষ্টি করে, তিনি কি সে লোকের সমতুল্য যে সৃষ্টি করতে পারে না? তোমরা কি চিন্তা করবে না? (সূরা নাহল- ১৬ঃ ১৭)

আরো বলা হয়েছে, ‘তারা তাঁর পরিবর্তে কত উপাস্য গ্রহণ করেছে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না এবং তারা নিজেরাই সৃষ্ট এবং নিজেদের ভালও করতে পারে না, মন্দও করতে পারে না এবং জীবন, মরণ ও পুনরুজ্জীবনেরও তারা মালিক নয়। (সূরা আল ফুরকান-২৫:০৩)

সত্য হলো এই, পৃথিবী হলো এক আধ্যাত্মিকতায় আর মায়ায় পরিপূর্ণ স্থান। এখানে মানুষ যতই জ্ঞান অর্জন করবে ততই বুঝতে সক্ষম হবেন, যিনি অনস্তিত্ব থেকে জগতকে অস্তিত্বে আনতে পারেন, যিনি শূন্যে বিতান সৃষ্টি করতে পারেন, তাঁর পক্ষে বিনে পিতায় একজন পয়গম্বর প্রেরণ করা খুব সহজ সরল একটি ব্যাপার।  বিশ্বাসীদের জন্যে এতে রয়েছে নিদর্শন ও চিন্তার খোরাক।

 

গোলাম সারোয়ার

কলামিস্ট ও লেখক ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *